বাংলাদেশে ৩৫ বছর ও তদূর্ধ্ব জনগোষ্ঠীর মধ্যে উচ্চ রক্তচাপের রোগী বাড়ছে

  • সর্বশেষ আপডেট : শুক্রবার, ২২ এপ্রিল, ২০২২
  • ১০
অনলাইন ডেস্কঃ ২২ এপ্রিল ২০২২ | সময়ঃ ২০:১২

খাবারে লবণ গ্রহণের মাত্রা কয়েক গুণবেশি, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস ও গড় আয়ু বৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশে ৩৫ বছর ও তদূর্ধ্ব জনগোষ্ঠীর মধ্যে উচ্চ রক্তচাপেররোগীর সংখ্যা বাড়ছে।


২০২০ সালে বাংলাদেশে উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা ছিল ৩ কোটি, যা ২০৩০ সাল নাগাদ গিয়ে দাঁড়াবে ৩ কোটি ৮০ লাখ। বাংলাদেশডেমোগ্রাফিক অ্যান্ডহেলথ সার্ভে ২০১৭-১৮’ অনুযায়ী, ২০১১থেকে ২০১৭-১৮ সাল সময়ের মধ্যে ৩৫ বছর ও তদূর্ধ্ব জনগোষ্ঠীর মধ্যে উচ্চ রক্তচাপের প্রকোপ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। পুরুষের মধ্যে ২০ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩৪ শতাংশে এবং নারীরক্ষেত্রে এ হার ৩২ শতাংশথেকে ৪৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতা রয়েছে এমন নারী এবং পুরুষের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত হওয়ার হার যথাক্রমে ৪৯ শতাংশ এবং ৪২ শতাংশ,যেখানে স্বাভাবিক ওজনের নারী এবং পুরুষের মধ্যে এই হার যথাক্রমে ২৫ শতাংশ এবং ২৪ শতাংশ। উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত অর্ধেক নারী (৫১ শতাংশ) এবং দুই-তৃতীয়াংশ পুরুষই (৬৭ শতাংশ) জানে নাযে তাদের উচ্চ রক্তচাপ রয়েছে। উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত অধিকাংশরোগীই (৬৪ শতাংশ) কোনো ওষুধ সেবন করে না। এমনকি বাংলাদেশে মৃত্যু এবং পঙ্গুত্বের প্রধান তিনটি কারণের একটি উচ্চ রক্তচাপ।দেশে বছরে ২ লাখ ৭৭ হাজার মানুষ হৃদ্রোগজনিত অসুস্থতায় মারা যায়, যার অন্যতম প্রধান কারণ উচ্চ রক্তচাপ।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, বাংলাদেশে প্রতিবছর ৫ লক্ষাধিক মানুষ অসংক্রামকরোগে মৃত্যুবরণ করেন, যার প্রায় অর্ধেক হৃদরোগজনিত। এদিকে বিশ্বের প্রায় উচ্চ রক্তচাপের সমস্যায় ভুগে থাকেন ১৫০ কোটি মানুষ। আর এই সমস্যায় সারা বিশ্বে প্রায় ৭০ লাখ মানুষ প্রতি বছর মারা যায়।
যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশে ৪০ বছরেরবেশি বয়সী মানুষের মধ্যে ২৬ শতাংশই উচ্চ রক্তচাপে ভুগছে।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা বলছেন, উচ্চ রক্তচাপ হৃদ্রোগ ও স্ট্রোকের (মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ) ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। বাংলাদেশে অপরিণত বয়সে বেশি মৃত্যু হচ্ছে হৃদ্রোগ ও স্ট্রোকে। দীর্ঘদিন অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপে ভোগা মানুষের কিডনি নষ্ট হয়ে যায়। দেশে কিডনি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির সংখ্যা দেড় কোটির বেশি।
ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হসপিটাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের উচ্চরক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ প্রোগ্রামের ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার ডা. শামীম জুবায়ের বাসসকে বলেন, এই যে প্রাপ্তবয়স্ক ২১ শতাংশ মানুষের উচ্চ রক্তচাপ, শুধু এটাই কিন্তু তাদের রোগ নয়, এছাড়াও তাদের আরও অন্যান্য অনেক রোগ রয়েছে। সেক্ষেত্রে এ বিশাল সংখ্যক মানুষের চিকিৎসা সেবা কিন্তু সরকারের জন্য বড় একটা চ্যালেঞ্জ। সুতরাং এ জায়গাটিতে আমাদের সচেতন হতে হবে। একইসঙ্গে হৃদরোগ ঝুঁকি তথা অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধে দেশে উচ্চ রক্তচাপ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এখন থেকেই সরকারি-বেসরকারি সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, প্রতিদিন একজন মানুষের ৫ গ্রাম লবণ খাওয়া দরকার। তবে দেখা যায় লবণ গ্রহণের মাত্রা কয়েক গুণ বেশি। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, একজন মানুষ দৈনিক ৯ থেকে ১১ গ্রাম লবণ ব্যবহার করেন। শুধু ভাত-তরকারিতে নয়, না জেনে বাইরের খাবার থেকেও তাদের শরীরে ঢুকছে মাত্রাতিরিক্ত লবণ। যে কারণে বাড়ছে উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি।
সচেতনতার তাগিদ দিয়ে তিনি আরও বলেন, উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই। ১৮ বছর বয়স থেকে প্রতি ছয় মাস অন্তর অন্তর প্রত্যেক ব্যক্তিকেই একবার করে ব্লাড প্রেশার মাপা উচিত। এতে যদি তার উচ্চ রক্তচাপ ধরা পড়ে এবং শুরুতেই সে জানতে পারে, তাহলে জীবন যাপন নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমেই সে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসতে পারবে।
উচ্চ রক্তচাপ নিয়ে সরকারি উদ্যোগে জনসচেতনতা সৃষ্টির বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির লাইন ডিরেক্টর অধ্যাপক ডা. মো. রোবেদ আমিন বলেন, প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য হাসপাতালে অসংক্রামক ব্যাধি কেন্দ্র খোলা হয়েছে। সেখানে মানুষের রক্তচাপ পরীক্ষা করা ছাড়াও পরামর্শ ও ওষুধ দেওয়া হয়। এ ছাড়া মানুষকে সচেতন করার বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নেওয়া হচ্ছে।
উচ্চরক্তচাপ রোগে আক্রন্ত হলে চিকিৎসকেরা বলছেন, উচ্চ রক্তচাপ মানুষের শরীরের প্রায় প্রতিটি অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলে। সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলে কিডনির ওপর। কিডনি রোগীদের প্রায় ৮০ শতাংশের রক্তচাপ স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকে। ৩০-৩৫ বছর বয়স থেকে নিয়মিত রক্তচাপ পরীক্ষা করা উচিত। উচ্চ রক্তচাপ শনাক্ত হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত ওষুধ খেতে হবে। রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে বাকি জীবন।
ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হসপিটাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের উচ্চরক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ প্রোগ্রামের প্রোগ্রাম ম্যানেজার ডা. মাহফুজুর রহমান ভূঁইয়া বলেন, অতিরিক্ত লবণ বন্ধ করতে পারলে ৫০ শতাংশের উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি কমে যেতো। একজন মানুষের প্রতিদিন ৫ গ্রাম লবণ প্রয়োজন অর্থাৎ এক চামচ। কিন্তু তার বেশি তারা খাচ্ছেন। জেনে খাচ্ছেন আবার না জেনেও খাচ্ছেন। ঘরে তিনি জেনে খাচ্ছেন। আর ঘরে-বাইরে যে খাবার খাচ্ছেন, তাতে কী পরিমাণ লবণ আছে, তা না জেনেই খাচ্ছেন। যেমন চিপসে ১০ গ্রাম লবণ থাকে। তা অনেকে জানেন না। শিঙারা-সমুচা বা হোটেল-রেস্টুরেন্টে বিভিন্ন খাবার খাচ্ছেন, তাতে কী পরিমাণ লবণ রয়েছে তা তিনি না জেনেই খাচ্ছেন। ফলে শরীরে ঢুকছে মাত্রাতিরিক্ত লবণ।
গ্লোবাল হেলথ অ্যাডভোকেসি ইনকিউবেটরের কান্ট্রি ডিরেক্টর মো. রুহুল কুদ্দুস বলেন, দেশে প্রতি ৫ জনে ১ জনের উচ্চ রক্তচাপে ভোগার যে তথ্য উঠে এসেছে, এটি খুবই ভয়াবহ। এই উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে আমাদের সবাইকেই সচেতন হতে হবে। সরকারের একার পক্ষে এই রোগ মোকাবিলা করা সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, দেশের সকল উপজেলায় এনসিডি কর্নারে আরও ডায়াবেটিসের চিকিৎসক দরকার। সেগুলোতে পরীক্ষা নিরীক্ষা আর ওষুধপত্রসহ সার্বিক সুযোগ সুবিধা আরও বাড়ানো দরকার।

শেয়ার করুন

আরও খবর

মুজিববর্ষ সম্পর্কে জানতে নিচে ক্লিক করুন