কাঁদতে কাঁদতে স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবসে প্রধানমন্ত্রী:, “ভাবলাম দেশের কাছে যাই, কখনও শুনি মা বেঁচে আছে, দুর্ভাগ্য! ষড়যন্ত্রে দলের লোকরাও ছিল”

  • সর্বশেষ আপডেট : মঙ্গলবার, ১৭ মে, ২০২২
  • ১৫
ভারতে নির্বাসিত জীবনের কথা বলতে গিয়ে কাঁদতে কাঁদতেই শেখ হাসিনা বলেন, “ভাবলাম দেশের কাছে যাই। কখনও শুনি, মা বেঁচে আছে। কখনও শুনি, রাসেল বেঁচে আছে। একেক সময় একেক খবর পেতাম। ওই আশা নিয়ে চলে আসলাম। কেউ বেঁচে থাকলে ঠিক পাব।

স্বাধীনতার চার বছরের মাথায় বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ের জন্য দলের ভেতরের মানুষদের ষড়যন্ত্রকেই দায়ী করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। স্বাধীনতার স্থপতিকে হত্যায় তৎকালীন মন্ত্রী খোন্দকার মোশতাক আহমেদের জড়িত থাকার কথা তুলে ধরে বঙ্গবন্ধুকন্যা বলেছেন, “আরও অনেকে এর মধ্যে জড়িত ছিল, এই ষড়যন্ত্রের সাথে। “আসলে ঘরের শত্রু বিভীষণ। ঘরের থেকে শত্রুতা না করলে বাইরের শত্রু সুযোগ পায় না। সে সুযোগটা (তারা) করে দিয়েছিল।” বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ের পর নিজের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবসে বুধবার আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়ের সময় একথা বলেন শেখ হাসিনা।

১৯৭৫ সালের ১৫ অগাস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার সময় দেশের বাইরে থাকায় বেঁচে গিয়েছিলেন দুই বোন শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা। ছয় বছর প্রবাসে থাকার পর প্রতিকূল অবস্থার মধ্যে ১৯৮১ সালে দেশে ফিরে বাবার দল আওয়ামী লীগের হাল ধরেন শেখ হাসিনা। তারপর এখন তৃতীয় মেয়াদে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। দেশের জনগণের উপর বিশ্বাস থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কখনও হত্যাকা-ের শিকার হওয়ার কথা ভাবতে পারেননি বলে জানান তার মেয়ে। শেখ হাসিনা বলেন, অনেকেই তাকে সাবধান করেছিলেন; এরকম একটা ঘটনা ঘটতে পারে। তিনি বিশ্বাসই করেন নাই। আব্বা বলতেন, ‘না, ওরা তো আমার ছেলের মতো, আমাকে কে মারবে? পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর দোসররাই বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেছিল, বলেন শেখ হাসিনা। এই হত্যাকা-ে যারা জড়িত ছিলেন, তাদের অনেকের নিয়মিত ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কে বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে যাওয়ার কথাও বলেন তিনি। “ডালিম (শরিফুল হক ডালিম), ডালিমের শ্বাশুড়ি, ডালিমের বউ, ডালিমের শালী ২৪ ঘণ্টা আমাদের বাসায় পড়ে থাকত। ডালিমের শ্বাশুড়ি তো সন্ধ্যা থেকে রাত পর্যন্ত ডালিমের বউ তো সারাদিনই আমাদের বাসায়।”

নিজের ভাই শেখ কামালের সঙ্গে খুনি মেজর এ এইচ এম বি নূর চৌধুরীর মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রধান সেনাপতি কর্নেল আতাউল গণি ওসমানীর এডিসি হিসাবে কাজ করার কথাও বলেন শেখ হাসিনা। “এরা তো অত্যন্ত চেনা মুখ।” আরেক খুনি সৈয়দ ফারুক রহমান বঙ্গবন্ধুর তৎকালীন মন্ত্রিসভার অর্থমন্ত্রী এ আর মল্লিকের শালীর ছেলে। “খুব দূরের না। এরাই ষড়যন্ত্র করল।”

২০০৭ সালে জরুরি অবস্থার সময় দলের নেতৃত্ব থেকে শেখ হাসিনাকে বাদ দেয়ার ষড়যন্ত্রের জন্যও আওয়ামী লীগ কর্মীদের রোষের শিকার হয়েছিলেন কয়েক নেতা। পরে শেখ হাসিনা বলেন, তিনি তাদের ক্ষমা করে দিলেও ভুলে যাননি। বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ের সঙ্গে জিয়াউর রহমানের জড়িত থাকার কথা আবারও বলেন শেখ হাসিনা; যে সেনা কর্মকর্তা তার কয়েক মাসের মধ্যে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেছিলেন। তিনি বলেন, “যারা এভাবে বেইমানি করে, মুনাফেকি করে, তারা কিন্তু এভাবে থাকতে পারে না। মোশতাক রাষ্ট্রপতি হয়ে জিয়াউর রহমানকে সেনাপ্রধান করে। তাদের মধ্যে অবশ্যই যোগসাজশ ছিল।”

জিয়ার পারিবারিক সমস্যা সমাধানে বঙ্গবন্ধুর উদ্যোগ নেয়ার কথা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, “জিয়াউর রহমান প্রতি সপ্তাহে একদিন তার স্ত্রীকে (খালেদা জিয়া) নিয়ে ওই ৩২ নম্বরের বাড়িতে যেত।” বঙ্গবন্ধু বাড়ি দুয়ার সবার জন্য অবারিত ছিল, যার সুযোগ ষড়যন্ত্রকারীরা নিয়েছিল বলে জানান শেখ হাসিনা। “তাদের যাওয়াটা আন্তরিকতা না.. চক্রান্ত করাটাই ছিল তাদের লক্ষ্য; সেটা বোধ হয় আমরা বুঝতে পারি নাই।” বঙ্গবন্ধুকন্যা বলেন, “আমার মাঝে মধ্যে মনে হয়, আব্বা যখন দেখেছেন, তাকে গুলি করছে, তারই দেশের লোক, তার হাতে গড়া সেনাবাহিনীর সদস্য, তার হাতে গড়া মানুষ.. জানি না তার মনে কী প্রশ্ন জেগেছিল?” স্বামী এম ওয়াজেদ মিয়ার গবেষণার কারণে ১৯৭৫ সালের ৩০ জুলাই জার্মানিতে গিয়েছিলেন শেখ হাসিনা; ছোট বোন শেখ রেহানাও সেখানে গিয়েছিলেন বেড়াতে। বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ের দিন দুই বোন ছিলেন বেলজিয়ামের ব্রাসেলসে। খবর শোনার পর পশ্চিম জার্মানিতে ফিরে তৎকালীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর বাসায় উঠেন তারা। পরে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বঙ্গবন্ধু পরিবারের সদস্যদের ভারতে থাকার ব্যবস্থা করেছিলো।

এক দিনে পরিবারের সবাইকে হারানোর দিনটি মনে করতে গিয়ে আবেগ ধরে রাখতে পারেননি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। “তখনও ততটা জানতে পরিনি কী ঘটে গেছে বাংলাদেশে। যখন জানতে পারলাম, তখন সহ্য করাটা কঠিন ছিল।” ওই সময় তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী কামাল হোসেনের পশ্চিম জার্মানির বন শহরে সংবাদ সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ের কথা চেপে রাখার কথাও বলেন শেখ হাসিনা। “এই হত্যাকা- সম্পর্কে একটা কথাও বললেন না। উনার কোথায় যাওয়ার কথা ছিল চলে গেলেন। হুমায়ুন রশীদ সাহেব এই হত্যাকা-কে কনডেম করলেন প্রেসের সামনে।” বঙ্গবন্ধু সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী কামাল হোসেন শেখ হাসিনার সময় আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীতেও ছিলেন। পরে আলাদা দল গড়েন তিনি। হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী পরে আওয়ামী লীগের হয়ে সংসদের স্পিকার হয়েছিলেন।

ভারতে নির্বাসিত জীবনের কথা বলতে গিয়ে কাঁদতে কাঁদতেই শেখ হাসিনা বলেন, “ভাবলাম দেশের কাছে যাই। কখনও শুনি, মা বেঁচে আছে। কখনও শুনি, রাসেল বেঁচে আছে। একেক সময় একেক খবর পেতাম। ওই আশা নিয়ে চলে আসলাম। কেউ বেঁচে থাকলে ঠিক পাব।

“২৪ অগাস্ট দিল্লি পৌঁছলাম। মিসেস গান্ধী (ইন্দিরা গান্ধী) আমাদের ডাকলেন। তার কাছ থেকে শুনলাম, কেউ বেঁচে নেই। হুমায়ুন রশীদ সাহেব আগে বলেছিলেন। কিন্তু আমি রেহানাকে বলতে পারি নাই। কারণ, ওর মনে একটা আশা ছিল, কেউ না কেউ বেঁচে থাকবে।” “দিল্লিতে মিসেস গান্ধী থাকার ব্যবস্থা করে দিলেন। ওয়াজেদ সাহেবকে (এম ওয়াজেদ মিয়া) এটমিক এনার্জিতে কাজের ব্যবস্থা করে দিলেন।” কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে শেখ হাসিনা বলেন, “এটা কী কষ্টের .. যন্ত্রণার কাউকে বুঝিয়ে বলতে পারব না।”

অর্থের কারণে ১৯৭৭ সালে বোন শেখ রেহানার বিয়েতে লন্ডনে যেতে না পারার বেদনা তুলে ধরে তিনি বলেন, “দুই ছেলে-মেয়ে নিয়ে যাব, অত টাকা ছিল না। আর, কোথায় থাকব?” ১৯৮০ সালে লন্ডনে যাওয়ার ক্ষেত্রে ইন্দিরা গান্ধীর ব্যবস্থা করে দেয়ার কথা স্মরণ করেন বঙ্গবন্ধুকন্যা। “ওর (শেখ রেহানা) যখন বাচ্চা হবে, আমি মিসেস গান্ধীকে গিয়ে বললাম, আমি যেতে চাই রেহানার কাছে। উনি ব্যবস্থা করে দিলেন। টিকেটের ব্যবস্থা করে দিলেন। থাকার ব্যবস্থা করে দিলেন।” “৮০ এর শেষে দিল্লিতে ফিরে আসি। টাকাও ছিল না। আর, কার কাছে হাত পাতা.. ভালো লাগত না।” ১৯৮০ সালে বিদেশে থাকার সময়ই আওয়ামী লীগের কাউন্সিলে সভাপতি নির্বাচিত করা হয় রাজনীতির বাইরে থাকা শেখ হাসিনাকে। তিনি বলেন, “এত বড় সংগঠন করার অভিজ্ঞতাও আমার ছিলে না। আমার চলার পথ অত সহজ ছিল না।”

দল এবং দলের বাইরে নানা প্রতিকূলতার কথা তুলে শেখ হাসিনা বলেন, “খুনিরা বহাল তবিয়তে বিভিন্ন দূতাবাসে কর্মরত। স্বাধীনতার বিরোধীরা তখন বহাল তবিয়তে। তারাই ক্ষমতার মালিক। যে পরিবারকে একেবারে নিশ্চিহ্ন করতে চেয়েছিলো, সে পরিবারের একজন এসে রাজনীতি করবে। “সেটা এত সহজ ছিল না, প্রতি পদে পদে প্রতিবন্ধকতা ছিল।” বক্তব্যের এই পর্যায়ে উপস্থিত নেতাদের আওয়ামী লীগের নতুন নেতৃত্ব খুঁজতে বলেন শেখ হাসিনা; তবে সবাই সমস্বরে ‘না না’ বলে উঠেন। শেখ হাসিনা বলেন, “নতুন নেতৃত্ব খোঁজা দরকার। জীবন-মৃত্যু আমি পরোয়া করি না। মৃত্যুকে আমি সামনে থেকে দেখেছি। আমি ভয় পাইনি। “আমি বিশ্বাস করি, আমার আব্বা আমাকে ছায়ার মতো আমাকে দেখে রাখেন.. আর, উপরে আল্লাহর ছায়া আমি পাই।” “মেয়ের হাত ধরে দুটা সুটকেস নিয়ে চলে আসি। আমি মনে করি, আমাকে যেতে হবে, কিছু করতে হবে,” ৩৬ বছর আগের এই দিনটিতে দেশে ফেরার কারণ ব্যাখ্যা করেন বঙ্গবন্ধুকন্যা।

জিয়াউর রহমানের বাধাতে ছয় বছর দেশের বাইরে ছিলাম-

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, জিয়াউর রহমানের বাধার কারণেই ছয় বছর দেশের বাইরে থাকতে হয়েছিলো তাকে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর হাতে শিক্ষাবৃত্তি প্রদান অনুষ্ঠানে একথা বলেন তিনি। দেশ বিরোধী ষড়যন্ত্র এখনও আছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, কোন ষড়যন্ত্রের পরোয়া না করেই বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত স্বপ্ন পূরণে কাজ করে যাবেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের জনগণের কাছে আমি কৃতজ্ঞ যে এতবড় দায়িত্ব আমাকে তারা দিয়েছিলেন। সেদিন আমাকে আওয়ামী লীগের প্রেসিডেন্ট করেছিলেন বলেই মানুষের যে ঢল নেমেছিলো সে কারণেই তখন জিয়াউর রহমান আমাকে বাধা দিয়ে রাখতে পারেনি। নইলে আমি ফেরত আসতে পারতাম না। এমনকি ফিরে আসার পর আমাকে ধানমন্ডি ৩২ এ যেতে দেয়নি এবং মিলাদও পড়তে দেয়া হয়নি। আমাকে বলা হয় অন্য একটা বাড়ি আমাদের দেবে। আমি বলেছিলাম কোনো বাড়ির লোভে আমি আসিনি। পরে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ৩৫০ জন মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীদের মাঝে শিক্ষাবৃত্তি প্রদান করেন শেখ হাসিনা। এসময় তিনি বলেন, তৎকালীন জেনারেল জিয়ার বাধা উপেক্ষা করে ছয় বছর পর দারিদ্রমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যেই তিনি দেশে ফিরে এসেছিলেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ছয় বছর আমরা দেশে আসতে পারিনি আজকের এই দিনে ফিরে এসেছিলাম। ছয়বছর রিফিউজি হিসেবে বিদেশে থাকতে হয়েছিলো। তখন জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় ছিলো তিনি আমাদের আসতে দেননি। আমার ফিরে আসার লক্ষ্যে একটাই ছিলো বাংলাদেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন করবো। দেশের মানুষের উন্নয়ন করবো।

কোনো অঞ্চলের মানুষ উপেক্ষিত থাকবে না-

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, দেশের কোন অঞ্চলে মানুষ উপেক্ষিত থাকবে না। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীকে সমাজের মূল ধারায় ফিরিয়ে এনে সকলের জন্য একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে তাঁর সরকার নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। তিনি বলেন, ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর যারা পিছিয়ে আছেন তাদের শিক্ষা-দীক্ষা এবং আর্থ-সামাজিকভাবে যাতে তাঁরা উন্নত হতে পারেন সেই উদ্যোগটা আমরা হাতে নিয়েছি।’ প্রধানমন্ত্রী এ সময় শিক্ষাকে অধিকার হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেন, ‘দেশের প্রায় ৫৫টি জেলায় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বসবাস রয়েছে। তাদের জীবনমান কিভাবে উন্নত করা যায় এবং সেই লক্ষ্যে আমরা কিছু বিশেষ এলাকা নিয়ে উন্নয়ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছি। এজন্য বাজেটেও আলাদা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।’

অনুষ্ঠানে ৩৫০ জন শিক্ষার্থীর প্রত্যেককে বৃত্তি হিসেবে ২৫ হাজার টাকার চেক প্রদান করা হয়। শেখ হাসিনা অনুষ্ঠানে ১৬ জন কৃতি শিক্ষার্থীর হাতে এই বৃত্তির চেক তুলে দেন। নিজ নিজ সংস্কৃতির ধারক ও বাহক হিসেবে এদিন চেক গ্রহণে আগত শিক্ষার্থীরা নিজস্ব সংস্কৃতির পোশাক পরিধান করায় সমগ্র অনুষ্ঠানটি একটি ভিন্ন মাত্রা লাভ করে।

দেশের প্রায় ৫৫টি জেলায় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বসবাস রয়েছে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, খুব ক্ষুদ্র আকারে হলেও এসব জেলায় তারা রয়েছেন। কজেই তাদের জীবনমান কিভাবে উন্নত করা যায় এবং সেই লক্ষ্য নিয়েই আমরা কিছু বিশেষ এলাকা নিয়ে উন্নয়ন কর্মসূচি গ্রহণ করি। এজন্য বাজেটে আলাদা করাদ্দ রাখার কথাও বলেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, আমরা সবসময় মনে করি শিক্ষা হচ্ছে একটি জাতির অধিকার। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় আয়োজিত এই অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করেন মুখ্য সচিব ড. কামাল আব্দুল নাসের চৌধুরী। প্রকল্প পরিচালক এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মহাপরিচালক কবির বিন আনোয়ার অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তৃতা প্রদান করেন।

ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ওরাং সম্প্রদায়ের লিমা তাত্তো বৃত্তি লাভের পর অনুষ্ঠানে নিজস্ব অনুভূতি ব্যক্ত করে বক্তৃতা করেন। শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ এ সময় উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া সরকারের মন্ত্রী পরিষদ সদস্যবৃন্দ, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাবৃন্দ, জাতীয় সংসদের সদস্যবৃন্দ, সরকারের উর্ধ্বতন কর্মকর্তা, বিদেশী কূটনিতিক, রাষ্ট্রদূত, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার প্রতিনিধিবৃন্দ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলো। প্রধানমন্ত্রী বলেন, সাওতাল, মুরং, হাজং, গারো, খাসিয়াসহ বহু ক্ষুদ ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী এদেশে রয়েছে। তাদের সংস্কৃতি শিক্ষা এবং মাতৃভাষার সম্মান বজায় রাখা আমাদের লক্ষ্য। যাতে এইসব বৈচিত্রময় নৃগোষ্ঠীর ভাষার এবং তাদের বিভিন্ন সংস্কৃতির চর্চা সঠিকভাবে তাঁরা করতে পারেন।

তিনি বলেন, সেই সাথে তারা যেন শিক্ষার দিক থেকে যেন পিছিয়ে না পড়ে। কারণ, বাংলাদেশকে সকল পর্যায়ের ছেলে-মেয়েরা লেখাপড়া শিখে সুশিক্ষায় সজ্জিত হয়ে শিক্ষিত জাতি হিসেবে গড়ে উঠব। প্রধানমন্ত্রী বলেন, নিজ নিজ পেশা তাঁরা করবেন কিন্তুু একজন শিক্ষিত মানুষ হিসেবে নিজ নিজ পেশায় অংশগ্রহণের সুযোগ পেলে সমগ্র পেশারই উৎকর্ষ সাধিত হবে।

সেদিকে লক্ষ্য রেখেই তার সরকার শিক্ষাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা যে দারিদ্র মুক্ত বাংলাদেশ গড়তে চাই, তা গড়তে হলে-অবশ্যই শিক্ষিত জাতি হিসেবে আমাদের দেশের মানুষকে গড়ে তুলতে হবে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসতে পারেনি এবং ২১ বছর পর ’৯৬ সালে ক্ষমতায় এসেই আওয়ামী লীগ সরকার আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করে উল্লেখ করে তিনি বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের সংঘাত নিরসনে শান্তি চুক্তিও করে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে দুই দশক ধরে যে সংঘাতময় পরিস্থিতি ছিল তা আওয়ামী লীগ সরকার দূর করে সেখানে শান্তি চুক্তি করে। তাদের উন্নয়নে পার্বত্য চট্টগ্রাম মন্ত্রণালয় গড়ে তোলে, পার্বত্য উন্নয়ন পরিষদ করে দেয় এবং বহুবিধ উন্নয়নের পদক্ষেপ গ্রহণ করে।

এ সময় প্রধানমন্ত্রী প্রাক-প্রাইমারী থেকে মাধ্যমিকে সকল স্তরে বিনামূল্যে বছরের প্রথম দিন পাঠ্য পুস্তক বিতরণ প্রাইমারী থেকে উচ্চ শিক্ষা পর্যায় পর্যন্ত বিভিন্ন ধরনের বৃত্তি ও উপবৃত্তি চালু এবং ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জন্য নিজস্ব ভাষায় পাঠ্য পুস্তক প্রণয়নের তথ্য তুলে ধরেন। ২০১৭ সালে তাঁর সরকার ৫টি নৃগোষ্ঠীর ভাষায় ৭৭ লাখ ২৮২টি বই ছাপিয়ে বিতরণ করেছে বলেও প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন।

সরকারপ্রধান বলেন, আমরা ২০১৮ সালের ১ জানুয়ারি পাঠ্যপুস্তক বিতরণকালে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ছেলে-মেয়েরা যাতে প্রথম শ্রেনীতে পড়ার জন্য নিজস্ব ভাষায় লিখিত বই পায় তার উদ্যোগ নেয়া হবে। এছাড়া, যাদের বর্ণমালা নেই তাদের বাংলাতেই লেখনি আয়ত্ব করার পরামর্শও দেন প্রধানমন্ত্রী। বৃত্তি প্রাপ্তদের প্রধানমন্ত্রী মনোযোগের সঙ্গে লেখাপড়া করে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর আহবান জানিয়ে বলেন, নিজেদের জীবনযাত্রা শিক্ষার মধ্যদিয়ে আরো উন্নত করার সুযোগ থাকে। সে দিকে দৃষ্টি দেয়াসহ ভালোভাবে লেখাপড়া করায় উৎসাহ প্রদানের জন্যই এই বৃত্তি প্রদান করা হচ্ছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তিনি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সংস্কৃতির যথাযথ বিকাশও কামনা করেন।

রাজধানীকে বাসযোগ্য করতে সরকারের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা-

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, বিগত দিনে কোন পরিকল্পনা যথাযথভাবে বাস্তবায়িত না হওয়ায় রাজধানী ঢাকার উন্নয়নে সব পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বহুমুখী সমস্যার সম্মুখিন হতে হচ্ছে। তিনি বলেন, রাজধানী ঢাকাকে একটি বাসযোগ্য নগরী হিসাবে গড়ে তুলতে আমরা সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। শেখ হাসিনা আজ তাঁর কার্যালয়ে ঢাকা মহানগরীর যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন সংক্রান্ত এক বৈঠকে এ কথা বলেন। বৈঠকে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাগণ ঢাকা মহানগরীর যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের জন্য দশটি প্রকল্পের উপর তাদের পরিকল্পনা প্রধানমন্ত্রীর সামনে উপস্থাপন করেন।

প্রকল্পগুলো হচ্ছে, ঢাকা সার্কুলার রোড : সেকেন্ড ফেস এবং ইষ্টার্ণ বাইপাস, ঢাকা না’গঞ্জ, ঢাকা টঙ্গি এবং ঢাকা মাওয়া রেল লাইন, টঙ্গি-না’গঞ্জ সাবওয়ে, মাস-র‌্যাপিড ট্রানজিট (এমআরটি) এবং বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি), ঢাকা ইলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, ঢাকা-আশুলিয়া ইলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, শান্তিনগর-ঢাকা-মাওয়া ফ্লাইওভার, গুলশান-বনানী-বারিধারা লেক প্রজেক্ট এবং বাস রুট র‌্যাশিওনালাইজেশন ও কোম্পানি বেজড অপারেশন ও বিআরটি এক্সপ্রেসওয়ে।

অনুষ্ঠানে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন, এলজিআরডি এবং সমবায় মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেন, রেলমন্ত্রী এম মুজিবুল হক, পানিসম্পদ মন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ এবং ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মেয়রদ্বয় উপস্থিত ছিলেন।

এসডিজি প্রোগ্রামের মুখ্য সমন্বয়কারি আবুল কালাম আজাদ অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ঢাকা মহানগরীর উন্নয়নের জন্য একটি মাষ্টার প্লান ছিল, অথচ অতিতের সরকারগুলো সড়ক, কালভার্ট ও লেন নির্মাণে কেউ এটি অনুসরণ করেনি। তিনি বলেন, নগরীতে যানবাহনের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে এবং মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থারও উন্নতি হচ্ছে। কিন্তু সড়কগুলো সে তুলনায় প্রশস্ত হচ্ছে না। রাজধানীর অধিকাংশ সড়ক উত্তর ও দক্ষিনমুখি।

শেখ হাসিনা বলেন, এই সমস্যা মাথায় রেখেই তার সরকার ১৯৯৬ সালে পূর্বাঞ্চলীয় বাইপাস প্রকল্প গ্রহন করেছিল। কিন্তু ২০০১ সালে ক্ষমতার পরিবর্তন হওয়ায় এই প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন হয়নি। সরকার প্রধান নগরীর যোগাযোগ ব্যবস্থাকে সহজ করা এবং দ্রুত ও সহজভাবে পণ্য পরিবহনের জন্য রাজধানীর চারপাশের বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাধের উপর দিয়ে সার্কুলার রোড ও ওয়াটার সার্কুলার পথ করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

শেখ হাসিনা আরো বলেন, নগরীতে বক্স কালভার্ট করার সময়ে অনেক লেক ও পুকুর ভরাট হয়ে গেছে। এতে নগরীতে জলাবদ্ধতা হচ্ছে। এক সময় নগরীর সকল লেক নদীর সাথে সংযুক্ত ছিল, অথচ সামরিক স্বৈর শাসনের সময়ে এর অধিকাংশই বন্ধ হয়ে গেছে। তিনি বলেন, জনগণের ভোগান্তি নিয়ে কোন উন্নয়ন কাজ হওয়া উচিৎ না, অথচ, অতিতে সেই কাজগুলোই হয়েছে, যা দুঃখজনক।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, নগরীতে বেশ কয়েকটি বাইপাস ও ওভারপাস নির্মীত হয়েছে। অনেক জমি অবৈধ দখল মুক্ত করা হয়েছে। তারপরও নগরীতে চলাচল আরো স্বাভাবিক করতে আমরা কাজ করে যাচ্ছি।

শেয়ার করুন

আরও খবর

মুজিববর্ষ সম্পর্কে জানতে নিচে ক্লিক করুন