ঢাকা, বাংলাদেশ সময়ঃ ৪:৩৫ অপরাহ্ণ শনিবার, ৮ মে, ২০২১
বিস্ময় প্রকাশ পরিকল্পনা কমিশনের * বৈদেশিক প্রশিক্ষণে চাওয়া হয়েছে ১ কোটি ৬১ লাখ টাকা * ব্যয় কমানোর সুপারিশ দেয়া হচ্ছে * এমন প্রস্তাবে আমি হতবম্ভ ও নির্বাক হয়ে যাচ্ছি -ড. জাহিদ হোসেন
অনলাইন ডেস্ক
অনলাইন ডেস্ক
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
পরামর্শক। প্রতীকী ছবি

এক হাজার ৪০০ মিটার একটি সেতু নির্মাণে প্রায় শতকোটি (৯৬ কোটি ৯৬ লাখ) টাকার পরামর্শকের প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে বিস্ময় প্রকাশ করেছে পরিকল্পনা কমিশন। বলা হয়েছে, মাত্র ১৪০০ মিটার সেতু নির্মাণের জন্য এত বেশি অর্থের পরামর্শক সেবার প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে সড়ক ও জনপথ অধিদফতরকে (সওজ) পিইসি (প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটি) সভায় অবহিত করতে হবে। এছাড়া একই প্রকল্পে বৈদেশিক প্রশিক্ষণ খাতে ১ কোটি ৬১ লাখ টাকার প্রস্তাব দিয়েছে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়।

‘সাইনবোর্ড-মোরেলগঞ্জ-রায়েন্দা-শরণখোলা-বগী সড়কের ১৭তম কিলোমিটারে পানগুচি নদীর ওপর পানগুচি সেতু নির্মাণ’ প্রকল্পে উল্লিখিত প্রস্তাব দেয়া হয়। সেতুটি বাগেরহাট জেলার মোরেলগঞ্জ উপজেলায় নির্মাণ করা হবে। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত হয় প্রকল্পটির পিইসি সভার কার্যপত্র থেকে জানা গেছে এসব তথ্য।

এ প্রসঙ্গে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সাবেক অতিরিক্ত সচিব ও বর্তমানে সেতু বিভাগের সচিব মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন যুগান্তরকে বলেন, এত টাকার পরামর্শক লাগার কথা নয়। আমরা ভুলতা ফ্লাইওভার করেছি একজনও পরামর্শক লাগেনি। তবে সেটি ছিল সম্পূর্ণ সরকারি অর্থে। বৈদেশিক ঋণ থাকলে তখন হয়তো পরামর্শকের কথা উঠত। তারপরও ১৪০০ মিটার একটি সেতু নির্মাণে এ ধরনের পরামর্শক ব্যয় অনেক বেশি।

বিশ্বব্যাংক ঢাকা অফিসের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন সোমবার বলেন, মাত্র ১৪০০ মিটার একটি সেতু নির্মাণে কেন পরামর্শক লাগবে? উপজেলা পর্যায়ে এ রকম শত শত ছোট সেতু বাংলাদেশে তৈরি হয়েছে। তারপরও কেন এখানে এত টাকার পরামর্শক সেবার প্রস্তাব করা হয়েছে, বিষয়টি হালকা করে দেখার সুযোগ নেই। এমন প্রস্তাবে আমি হতবম্ভ ও নির্বাক হয়ে যাচ্ছি। তাছাড়া প্রশিক্ষণের নামে বিদেশ সফরের আদৌ কোনো প্রয়োজন আছে কিনা সেটিও খতিয়ে দেখা উচিত। এ খাতে এক টাকাও ব্যয় করা উচিত নয়।

সূত্র জানায়, প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে ৯৯৬ কোটি ৭৬ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারি তহবিলের ৫৯০ কোটি ৩ লাখ টাকা এবং কুয়েত ফান্ড ফর আরবান ইকোনমিক ডেভেলপমেন্টের (কেএফএইডি) ঋণ থেকে ৪০৬ কোটি ৭২ লাখ টাকা ব্যয় করা হবে। প্রক্রিয়াকরণ শেষে অনুমোদন পেলে চলতি বছর থেকে শুরু হয়ে ২০২৫ সালের জুনের মধ্যে এটি বাস্তবায়ন করবে সড়ক ও জনপথ অধিদফতর (সওজ)।

প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দেশের দক্ষিণাঞ্চলে উপজেলা পর্যায়ে নিরবচ্ছিন্ন সড়ক নেটওয়ার্কের উন্নতি এবং বাগেরহাট জেলার সঙ্গে মোরেলগঞ্জ ও শরণখোলা উপজেলাসহ রাজধানী এবং মোংলা বন্দরের নিরবচ্ছিন্ন সড়ক যোগাযোগ স্থাপন হবে। ফলে সুন্দরবন সংলগ্ন এ এলাকার অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও পর্যটন শিল্পের উন্নতি ত্বরান্বিত হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

গত ২৯ নভেম্বর অনুষ্ঠিত পিইসি সভার কার্যপত্রে বলা হয়েছে, প্রকল্পের বিভিন্ন পরামর্শক সেবা খাতে ৯৬ কোটি ৯৬ লাখ টাকা চাওয়া হয়েছে। এর মধ্যে সরকারি তহবিল থেকে ৬৭ কোটি ৭৯ লাখ টাকা এবং বৈদেশিক ঋণ থেকে ২৯ কোটি ১৭ লাখ টাকার প্রস্তাব করা হয়। মাত্র ১৪০০ মিটার সেতু নির্মাণের জন্য এত বেশি অর্থের পরামর্শক সেবার প্রয়েজনীয়তার বিষয়ে সওজ অধিদফতর সভাকে অবহিত করবে।

এছাড়া বৈদেশিক প্রশিক্ষণে মোট ১ কোটি ৬১ লাখ টাকার প্রস্তাব করা হয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে বৈদেশিক প্রশিক্ষণ ব্যয় বাদ দেয়া যেতে পারে। অথবা যৌক্তিকভাবে হ্রাস করা যেতে পারে। রাজস্ব খাতে প্রস্তাবিত অঙ্গগুলোর ব্যয় আলোচনা সাপেক্ষে যৌক্তিকভাবে নির্ধারণ করা যেতে পারে। প্রকল্পে জেনারেল অ্যান্ড সাইট ফ্যাসিলিটিজ খাতে ১৯ কোটি ১৫ লাখ টাকার প্রস্তাব করা হয়েছে। এ খাতের ব্যয় নির্ধারণের ভিত্তির বিষয়ে আলোচনা করা যেতে পারে।

১৫০০ মিটার রিভার ট্রেনিং খাতে ৬০ কোটি টাকার প্রস্তাব করা হয়েছে। এ কাজটি বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড নাকি সওজ অধিদফতরের মাধ্যমে সম্পন্ন করা হবে তা স্পষ্ট নয়। কার্যপত্রে আরও বলা হয়েছে, প্রস্তাবিত প্রকল্পে কর্মকর্তা ও কর্মচারী, হায়ারিং চার্জ ও সিকিউরিটি সার্ভিসের জন্য জনবলের সংস্থান রাখা হয়েছে। এই জনবলের বিষয়ে অর্থ বিভাগের উন্নয়ন প্রকল্পের জনবল নির্ধারণ সংক্রান্ত কমিটির সুপারিশ অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।

এক্ষেত্রে ওই কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী জনবলের বেতন-ভাতা খাতের ব্যয় প্রাক্কলন করা যেতে পারে। প্রকল্পের আওতায় ইউটিলিটি স্থানান্তর বাবদ ২ কোটি টাকার প্রস্তাব করা হয়েছে। এই ব্যয় যৌথ জরিপের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট সংস্থা হতে সংগ্রহ করে নির্ধারণ করা যৌক্তিক হবে।

এছাড়া প্রকল্পে ১৭ দশমিক ৮৩ হেক্টর ভূমি অধিগ্রহণ বাবদ ৭৬ কোটি ৩২ লাখ টাকা এবং পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণ বাবদ ১৯ কোটি ৭৫ লাখ টাকার প্রাক্কলন করা হয়েছে। জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের প্রস্তাব অনুযায়ী এ ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে কিনা সে বিষয়ে ডিপিপিতে কোনো ডকুমেন্ট সংযুক্ত না থাকায় বিষয়টি স্পষ্ট নয়।

পরিকল্পনা কমিশনের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে যুগান্তরকে জানান, পরামর্শক ব্যয় অত্যধিক বেশি মনে হওয়ায় পিইসি সভায় জানতে চাওয়া হয়। সন্তোষজনক ব্যাখ্যা না পাওয়ায় আলোচনার পর প্রায় অর্ধেক কমিয়ে দিতে বলা হচ্ছে। এছাড়া বৈদেশিক প্রশিক্ষণ খাতেও ব্যয় কমানোর সুপারিশ দেয়া হয়েছে। এসব সুপারিশ মেনে ডিপিপি (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব) সংশোধন করে পুনরায় পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানোর পর একনেকে উপস্থাপনের প্রক্রিয়া শুরু করা হবে।

প্রকল্পের আওতায় প্রধান কার্যক্রম হচ্ছে, ১৪০০ মিটারের একটি ব্রিজ নির্মাণ, ভূমি অধিগ্রহণ এবং পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণ কাজ করা হবে। এছাড়া মাটির কাজ, এপ্রোচ সড়ক নির্মাণ, রিজিড পেভমেন্ট নির্মাণ, রিভার ট্রেনিং, টোল প্লাজা নির্মাণ, এক্সেল লোড নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র নির্মাণসহ আনুষঙ্গিক কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হবে।

প্রকল্প প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, তৃতীয় কোনো প্রতিষ্ঠান দিয়ে প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করা হয়েছে। ওই সমীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রস্তাবিত সড়কটির অ্যানুয়েল এভারেজ ডেইলি ট্রাফিক ১১ হাজার ১৭৫টি। এর মধ্যে ভারি যানবাহন হচ্ছে ৫৮০টি এবং হালকা যানবাহন ১০ হাজার ৫৯৫টি। সেতুটি টোলযুক্ত হবে তাই আর্থিকভাবে লাভজনক।

এছাড়া সুন্দরবন এলাকার অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও পর্যটন শিল্পের উন্নতিসহ প্রকল্প এলাকায় উৎপাদিত মৎস্য ও কৃষিপণ্য পরিবহন সহজ হবে। ফলে স্বল্প সময়ে ও কম খরচে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের অন্যান্য এলাকায় পৌঁছাতে পারবে।

Adddd_Logo.png
 ইউনিভার্স ট্রিবিউন