ঢাকা, বাংলাদেশ | সময়ঃ ৪:৩১ পূর্বাহ্ণ
আজ শুক্রবার, ৭ মে, ২০২১
অনলাইন ডেস্ক
অনলাইন ডেস্ক
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
ছবি: সংগৃহীত
কারও মুখে মাস্ক আছে, আরও মুখে নেই; তবে আবরণে আভরণে অঙ্গে অঙ্গে আছে বাসন্তি সাজ।

মহামারীর শোক ছাপিয়ে চরাচর সেজেছে শিমুলে, পলাশে; মাতাল সমীরণে ভাসছে ঋতুরাজের আগমনী গান।

ধূসর-বিবর্ণ ধরণী জুড়ে আজ রঙের উৎসব। আজ ফগুনের প্রথম দিন।

‘বসন্ত বন্দনা’য় কবি নির্মলেন্দু গুণ যেমন বলেছেন, ‘আগ্রাসী ও অনতিক্রম্য’ এ ঋতু থেকে যে চোখ ফেরানোই দায়!

তাই নিসর্গে ঋতুরাজের রঙিন শাসনের অভিষেকে ঢাকাবাসীর আয়োজনেও কমতি নেই।

 
 

রোববার ভোরে জাতীয় বসন্ত উৎসব উদযাপন পরিষৎ – এর আয়োজনে ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের মুক্তমঞ্চে হল বসন্ত উৎসব। রঙে রঙিন হয়ে তাতে সামিল হলেন নগরবাসী।

 

হলুদ, কমলা, লাল, সবুজের বাহারি বসন, চুলে হলুদ গাঁদা কিংবা মাথায় ফুলের মুকুট, কপালে টিপ- এ  হল বাঙালি নারীর বসন্ত সাজ।

উজ্জ্বল রঙ লেগেছে পুরুষের সাজেও, তা সে পাঞ্জাবিই হোক, কিংবা টি-শার্ট ।

বরাবর ১৩ ফেব্রুয়ারি বসন্ত উৎসব পালিত হলেও গত বছর বাংলা একাডেমির সংশোধিত বাংলা বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী বসন্ত উৎসব এখন থেকে ১৪ ফেব্রুয়ারি পালিত হচ্ছে।

সকাল সাড়ে ৭টায় দীপেন সরকারের যন্ত্র বাদনে শুরু হয় নগরবাসীর বসন্ত বন্দনা। এরপর পংক্তিমালায় বসন্তের আবাহন করেন এবছরের একুশে পদকপ্রাপ্ত আবৃত্তিশিল্পী ভাস্কর বন্দোপাধ্যায়।

পংক্তিমালায় বসন্তের আবাহন করেন এবছরের একুশে পদকপ্রাপ্ত আবৃত্তিশিল্পী ভাস্কর বন্দোপাধ্যায়।

 

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের মুক্তমঞ্চে রোববার সকালে গানে গানে ঋতুরাজ বসন্তকে স্বাগত জানান শিল্পীরা। ছবি: সংগৃহীত

দলীয় সংগীত পরিবেশন করেন সুর সপ্তক, বুলবুল ললিতকলা একাডেমি, সত্যেন সেন শিল্পীগোষ্ঠীর সদস্যরা।

 

আ স্বপ্নবিকাশ কলা কেন্দ্র, নৃত্যছন্দ, সুরবিহার, আঙ্গীকাম, ধ্রুপদ কলাকেন্দ্র, ভাবনা ধৃতি, দ্রুপদী নৃত্য প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, সাধনা সংস্কৃতি মণ্ডল, নৃত্যাক্ষ, স্পন্দন, বুলবুল ললিতাকলা একাডেমি, মুদ্রা, মৌমিতা, মারমা সম্প্রদায়, সাঁওতাল সম্প্রদায় ও কথক নৃত্য সম্প্রদায়ের পরিবেশনায় ছিল দলীয় নৃত্যঅ

শিল্পী বিজন চন্দ্র মিস্ত্রী, বিমান চন্দ্র বিশ্বাস, শোয়েব, সঞ্জয় কবিরাজ, জান্নাতুল ফেরদৌস কাকলি, কাইয়ুম, নুসরাত বিনতে নূর ও নবনিতা জাইদ চৌধুরীর কণ্ঠে একক সংগীতেও ছিল বসন্তের বন্দনা। 

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এ আয়োজনের উদ্বোধন করেন নাট্যজন নাসির উদ্দীন ইউসুফ বাচ্চু। 

তিনি বললেন, “অতিমারীর এ দুঃসময়কে পাশে ঠেলে বসন্তের অনুপ্রেরণায় এগিয়ে যাবে বাঙালি, এই হোক প্রার্থনা।

 

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের মুক্তমঞ্চে রোববার সকালে বসন্ত উৎসবে নৃত্য পরিবেশনা। ছবি: সংগৃহীত

আর উৎসব পরিষৎ এর সভাপতি কাজল দেবনাথ বলেন, “আমাদের সব অর্জন কিন্তু প্রকৃতি থেকে। এ দিনে তরুণ প্রজন্মের কাছে আহ্বান, তারা যেন এ প্রকৃতির মধ্যে নিজেকে বিলিয়ে দেয়।”

 

এবারের বসন্ত কথন পর্বে আলোচক ছিলেন স্থপতি সফিউদ্দিন আহমেদ ও গণসঙ্গীত শিল্পী মানজার চৌধুরী সুইট।

দিনভর নানা আয়োজন

জাতীয় বসন্ত উৎসব উদযাপন পরিষৎ বিকাল সাড়ে ৩টায় গেণ্ডারিয়ার সীমান্ত গ্রন্থাগার প্রাঙ্গনেও বসন্ত উৎসবের আয়োজন করেছে।

বসন্ত কথন পর্ব শেষে সেখানে একক সংগীত পরিবেশন করবেন দিলদার হোসেন মুক্তার, প্রদীপ সরকার, সংযুক্তা রায়, ঢালী মো. দেলোয়ার, এসএম মেজবা উদ্দিন, শান্তা সরকার, উদয় শংকর বসাক, শ্রাবণী গুহ রায়, ঐশ্বর্য বসাক, মো. টিটু আলী, সাধনা মিত্র ও তাহমিনা খন্দকার মুক্তি।

দলীয় সংগীত পরিবেশন করবে সীমান্ত খেলাঘর আসর, গেণ্ডারিয়া কিশলয় কঁচি-কাঁচার মেলা, মৈত্রী শিশুদল, কিশোর থিয়েটার, রঙ্গপীঠ শিশুদল, শাপলা কঁচি-কাঁচার আসর, চাইল্ড-হেভেন ললিতকলা একাডেমি, সপ্তকলির আসর, মহীরুহু, মরমী লোকগীতি শিল্পীগোষ্ঠী।

উত্তরার আজমপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠেও বসন্ত উৎসব আয়োজন করেছে পরিষৎ।

 

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের মুক্তমঞ্চে রোববার সকালে বসন্ত উৎসবে সাঁওতাল সম্প্রদায়ের শিল্পীদের নৃত্য। ছবি: সংগৃহীত

সেখানে দলীয় নৃত্য পরিবেশন করবেন তাল কালচারাল সেন্টার সেন্টার, অনুপ্রাস খেলাঘর, অঞ্জলি নৃত্যকলা নিকেতন ও প্রার্থনা ললিতকলার শিল্পীরা। একক আবৃত্তি করবেন প্রসাত কুমার চক্রবর্তী, সোলায়মান কবীর, ফারজানা মালিক, সোহেল আনোয়ার, দীপক চন্দ্র, আশরাফুল আলম ও শফিউল গণি।

 

তাছাড়া একক ও দলীয় সংগীতের পরিবেশনাও থাকছে সেখানে।

শিল্পকলা একাডেমিতে বসন্ত উৎসব

বিকাল ৪টায় শিল্পকলা একাডেমির নন্দন মঞ্চে শুরু হবে বসন্ত উৎসবের আয়োজন। সেখানে আলোচনা পর্বে সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদও থাকবেন।

একাডেমির সাংস্কৃতিক পরিবেশনায় থাকছেন বাংলাদেশ ওয়ার্ল্ড পারফরমিং আর্টস, স্পন্দনের শিশু শিল্পীর দল, নৃত্যালোক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, বাংলাদেশ একাডেমি অফ ফাইন আর্টস, নৃত্যম, নন্দন কলা কেন্দ্র, মারমা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সম্প্রদায়, ধৃতি নর্তনালয়ের শিল্পীরা ।

দ্বৈত সংগীত পরিবেশন করবেন শিল্পী সাজেদ আকবর ও সালমা আকবর, ইবরার টিপু-বিন্দু কনা এবং খাইরুল আনাম শাকিল-কল্পনা আনাম ।

 

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের মুক্তমঞ্চে রোববার সকালে গানে গানে ঋতুরাজ বসন্তকে স্বাগত জানান শিল্পীরা। ছবি: সংগৃহীত

একক সংগীতের পরিবেশনায় শিল্পী অপু আমান, সাব্বির, বিউটি এবং দিতি সরকার শোনাবেন বসন্তের গান। দলীয় সংগীত পরিবেশন করবে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি সংগীতদল, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি ভাওয়াইয়া সংগীতদল, সরকারি সংগীত কলেজ এবং জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিল্পীরা।

 

নাটকের অংশবিশেষ পাঠ করবেন শহীদুজ্জামান সেলিম -রোজী সিদ্দিকী এবং অনন্ত হীরা -নূনা আফরোজ দম্পতি। সবশেষে থাকবে ব্যান্ডদল ‘স্পন্দন’ এর পরিবেশনা।

বঙ্গে বসন্ত উৎসব

পুরীতে ফাল্গুন মাসে যে দোলযাত্রা উৎসব হত, তার অনুকরণে বঙ্গেও প্রবর্তিত হয় এই উৎসব।

১৫৮৫ সালে সম্রাট আকবর বাংলা বর্ষপঞ্জি হিসেবে আকবরি সন বা ফসলি সনের প্রবর্তন করেন। তিনি প্রতি বছর ১৪টি উৎসব পালনের রীতিও প্রবর্তন করেন। এর মধ্যেই অন্যতম ছিল বসন্ত উৎসব।

১৯০৭ সালে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোট ছেলে শমীন্দ্রনাথ ঠাকুরের হাত ধরে শান্তিনিকেতনে যাত্রা শুরু করে বসন্ত উৎসব, যা ‘ঋতুরঙ্গ উৎসব’ নামেই পরিচিত।

স্বাধীন বাংলাদেশে বসন্ত উৎসবের গোড়াপত্তন গত শতকের নব্বইয়ের দশকে। স্বৈরাচারী এরশাদের পতনের আন্দোলনে গোটা দেশ যখন উদ্বেলিত, সেই সময়ে সাংস্কৃতিক আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের বকুলতলায় ছোট্ট পরিসরে শুরু হয় বসন্ত উৎসব।

স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের জন্য বানিয়ে রাখা রঙিন কাগজের ফুল, প্রজাপতি ও পাখির অবয়ব নিয়ে চারুকলা অনুষদের ৮৯তম ব্যাচের শিক্ষার্থীরা বর্ণিল শোভাযাত্রা বের করেন।

পরে বঙ্গাব্দ ১৪০১ সালে জাতীয় বসন্ত উৎসব উদযাপন পরিষৎ- এর আয়োজনে আনুষ্ঠানিকভাবে ঢাকায় শুরু হয় বসন্ত উৎসব।